কুরআন তেলাওয়াত ও তাদাব্বুরের আদব সমূহ
পবিত্র কুরআনুল কারীম হলো বিশ্বজগতের প্রতিপালক মহান আল্লাহর বাণী। এটি মানবজাতির হেদায়াত, অন্তরের আরোগ্য এবং হেদায়াতের মহাসড়ক। মহান আল্লাহর এই মহাগ্রন্থের তিলাওয়াত, শ্রবণ ও অনুধাবনের (তাদাব্বুর) জন্য কিছু মৌলিক বাহ্যিক ও আত্মিক আদব রয়েছে। কুরআনের আদব ও সম্মান বজায় রেখে তিলাওয়াত করলে তা অন্তরে আলোর স্ফুরণ ঘটায় এবং তিলাওয়াতকারীর জন্য অশেষ সওয়াব ও রহমত নিয়ে আসে।
১. কুরআন তিলাওয়াতের মূল উদ্দেশ্য ও মর্যাদা
কুরআন কেবল পড়ার জন্য নাজিল হয়নি, বরং এটি আত্মস্থ করা, তা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা এবং জীবনে বাস্তবায়ন করার জন্য অবতীর্ণ হয়েছে। আল্লাহ তাআলা সূরা সোয়াদে ঘোষণা করেন:
২. তিলাওয়াতের পূর্বপ্রস্তুতি ও বাহ্যিক আদবসমূহ (External Etiquette)
কুরআন তিলাওয়াতে বসার আগে শরীর, পোশাক ও পরিবেশের বাহ্যিক পবিত্রতা অর্জন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ:
- ১. পূর্ণ পবিত্রতা (অজু করা): পবিত্র কুরআনের মুসহাফ স্পর্শ করার জন্য অজু করা আবশ্যক। ওজু অবস্থায় তিলাওয়াত করা সর্বাত্তম সুন্নাত।
- ২. মেসওয়াক করা: তিলাওয়াতের আগে মুখ পরিষ্কার ও সুগন্ধিময় করার জন্য মেসওয়াক করা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রিয় সুন্নাত।
- ৩. পবিত্র ও নিরিবিলি স্থান নির্বাচন: মসজিদ বা ঘরের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন শান্ত স্থানে বসে পড়া উত্তম। ময়লা বা হইচই পূর্ণ স্থানে তিলাওয়াত করা অনুচিত।
- ৪. কিবলামুখী হয়ে বিনয়ের সাথে বসা: অহংকার বা হেলান দিয়ে না বসে কিবলামুখী হয়ে আদবের সাথে বসা।
- ৫. তাআউউজ ও তাসমিয়া পড়া: তিলাওয়াত শুরুর আগে "আউজু বিল্লাহি মিনাশ শায়ত্বানির রাজীম" এবং "বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম" পড়া সুন্নাত।
৩. তিলাওয়াতের সময় আত্মিক আদবসমূহ (Internal & Spiritual Etiquette)
বাহ্যিক আদবের পাশাপাশি অন্তরের আদব হলো তিলাওয়াতের প্রাণ। তিলাওয়াতকালে অন্তরে যে অনুভূতির সঞ্চার হওয়া আবশ্যক:
- কুরআনের মহানত্ব অনুধাবন: এটি কোনো সৃষ্টি বা মানুষের কথা নয়, বরং আসমান-জমিনের মালিক মহান আল্লাহর বাণী—একথা স্মরণে রাখা।
- আল্লাহ আমাকে সম্বোধন করছেন ভাবা: তিলাওয়াতকারী মনে করবে প্রতিটি নির্দেশ ও উপদেশ সরাসরি তার জন্যই নাজিল হচ্ছে।
- উপস্থিত অন্তর (হুজুরে কলব): অনর্থক চিন্তা বাদ দিয়ে কেবল আল্লাহর কালামের দিকে মনোযোগ নিবদ্ধ রাখা।
- ভীতি ও কান্নার ভাব তৈরি করা: আল্লাহর আজাব ও কিয়ামতের কড়াকড়ির আয়াত তিলাওয়াতকালে অন্তরে ভয় সঞ্চার করা ও সম্ভব হলে ক্রন্দন করা।
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেন: “তোমরা কুরআন তিলাওয়াত করো এবং কাঁদো। যদি কান্না না আসে, তবে কান্নার ভান বা ক্রন্দনের আকৃতি ধারণ করো।”
— সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৩৩৭
৪. তারতীল ও তাজবীদ অনুযায়ী ধীরস্থিরে পড়া
কুরআন দ্রুত তড়িঘড়ি করে পড়া ঠিক নয়। তাজবীদের নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি হরফ তার মাখরাজ ও সিফাত বজায় রেখে সুন্দর ও স্পষ্ট উচ্চারণে তিলাওয়াত করা আল্লাহর নির্দেশ:
৫. কুরআন তাদাব্বুর (গভীর চিন্তাভাবনা) করার পদ্ধতি
তাদাব্বুর ছাড়া তিলাওয়াত অন্তরে গভীর প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে না। তাদাব্বুর করার জন্য নিম্নোক্ত আমলসমূহ অনুসরণ করা উচিত:
- অর্থ ও তাফসীর পড়া: নির্ভরযোগ্য বাংলা তাফসীর (যেমন তাফসীরে ইবনে কাসীর বা মাআরিফুল কুরআন) সহ আয়াত পাঠ করা।
- আয়াতে থামা ও দোয়া করা: রহমতের আয়াত আসলে আল্লাহর কাছে জান্নাত ও রহমত চাওয়া, আজাবের আয়াত আসলে জাহান্নাম থেকে পানাহ চাওয়া।
- আয়াত বারবার পুনরাবৃত্তি করা: রাসূল (সা.) ও সাহাবীগণ অন্তরে গভীর প্রভাব ফেলে এমন একটি আয়াত সারা রাত বারবার তিলাওয়াত করতেন।
৬. কুরআন তিলাওয়াতের অপরিসীম সওয়াব ও আখেরাতের মর্যাদা
পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতকারীর জন্য দুনিয়া ও আখেরাতে অগণিত বরকত ও উচ্চ মর্যাদার প্রতিশ্রুতি রয়েছে:
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন: “যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাব থেকে একটি হরফ পাঠ করবে, সে একটি নেকি পাবে; আর একটি নেকির সওয়াব হলো দশ গুণ। আমি বলছি না যে 'আলিফ-লাম-মীম' একটি হরফ; বরং আলিফ একটি হরফ, লাম একটি হরফ এবং মীম একটি হরফ।”
— জামে আত-তিরমিযী: ২৯১০
“কিয়ামতের দিন কুরআন তিলাওয়াতকারীকে বলা হবে: তিলাওয়াত করতে থাকো এবং ওপরে উঠতে থাকো। ধীরস্থিরে তারতীলের সাথে তিলাওয়াত করো, যেমন দুনিয়াতে করতে। নিশ্চয়ই তোমার অবস্থান (জান্নাতের উচ্চ মর্যাদা) হবে তোমার তিলাওয়াতকৃত শেষ আয়াতের স্থানে।”
— সুনানে আবু দাউদ: ১৪৬৪, তিরমিযী: ২৯১৪
৭. বহুল জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)
প্রশ্ন: অজু ছাড়া কি কুরআন মুখস্থ পড়া যাবে?
উত্তর: হ্যাঁ, মুখস্থ বা মোবাইল স্ক্রিনে হাত না দিয়ে দেখে তিলাওয়াত করা অজু ছাড়াও জায়েজ। তবে ওজু অবস্থায় পড়া উত্তম। তবে মুসহাফ বা কাগজের কুরআন স্পর্শ করার জন্য অজু আবশ্যক।
প্রশ্ন: সেজদায়ে তিলাওয়াত করার সঠিক নিয়ম কী?
উত্তর: কুরআনের সেজদার আয়াত তিলাওয়াত করলে বা শুনলে একটি সেজদা করা ওয়াজিব। সেজদার জন্য অজু অবস্থায় সোজা দাঁড়িয়ে 'আল্লাহু আকবার' বলে সেজদায় গিয়ে 'সুবহানা রাব্বিয়াল আ'লা' ৩ বার পড়ে উঠে দাঁড়াতে হয়।