মহাগ্রন্থ আল-কুরআন হলো মানবজাতির হেদায়েতের জন্য মহান আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ চূড়ান্ত আসমানী কিতাব। কিয়ামত পর্যন্ত আগমনকারী সকল মানুষের ইহকাল ও পরকালের মুক্তির একমাত্র পথনির্দেশক এটি। কুরআন তিলাওয়াত অত্যন্ত সওয়াবের কাজ; এর প্রতিটি বর্ণ উচ্চারণে ১০টি করে নেকী পাওয়া যায়। তাই আদব ও সম্মান বজায় রেখে সঠিক নিয়মে কুরআন তিলাওয়াত করা প্রত্যেক মুসলিমের ঈমানী দায়িত্ব।
"আর আপনি কুরআন তিলাওয়াত করুন ধীরস্থিরভাবে ও স্পষ্ট উচ্চারণে (তারতীলের সাথে)।" (সূরা আল-মুযযাম্মিল: ৪)
"যাদেরকে আমি কিতাব প্রদান করেছি, তারা তা তিলাওয়াত করে যেভাবে তিলাওয়াত করা উচিত। তারাই এর ওপর প্রকৃত ঈমান রাখে।" (সূরা আল-বাকারা: ১২১)
কুরআন তিলাওয়াতের ১০টি বিশেষ আদব ও মাসনূন নিয়ম
- পবিত্রতা অর্জন: তিলাওয়াত শুরুর পূর্বে ওযূ করে নেওয়া এবং শরীর ও পোশাক পবিত্র রাখা।
- মুখ পরিচ্ছন্ন রাখা: মিসওয়াক বা ব্রাশ করে মুখের দুর্গন্ধ দূর করে কিতাব স্পর্শ করা।
- পবিত্র স্থানে কিবলামুখী হওয়া: ক্বিবলার দিকে মুখ করে অত্যন্ত বিনীতভাবে বসা।
- ইস্তিজা ও বাসমালাহ পাঠ: তিলাওয়াত শুরুর আগে "আ'উযু বিল্লাহি মিনাশ শায়ত্বানির রাজীম" এবং "বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম" পড়া।
- তারতীল বা ধীরস্থিরতা: তাড়াহুড়ো না করে প্রতিটি হরফ ও মাখরাজ স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করা।
- অর্থ ও উপদেশ অনুধাবন: তিলাওয়াতের সময় আয়াতের অর্থ ও মহান আল্লাহর কুদরত নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা।
- সাজদায়ে তিলাওয়াত আদায়: তিলাওয়াতের সময় সাজদাহর আয়াত আসলে সাথে সাথে তিলাওয়াতের সাজদাহ প্রদান করা।
- সুন্দর কণ্ঠে তিলাওয়াত: সুর করে সুন্দর ও মিষ্ট স্বরে কুরআন পাঠ করা সুন্নত।
- আদব বজায় রাখা: তিলাওয়াত চলাকালে অনর্থক হাসাহাসি, মোবাইল চালানো বা কথা বলা থেকে বিরত থাকা।
- কুরআন উঁচুতে রাখা: কুরআনের সম্মান রক্ষার্থে তা সর্বদা বুক সমান উঁচুতে রাখা, নিচে বা মাটিতে না রাখা।
বিশেষ বিশেষ সুরার ফজিলত ও হাদিসের বর্ণনা
১. সূরা আল-ফাতিহা (উম্মুল কুরআন)
সূরা ফাতিহা হলো কুরআনের শ্রেষ্ঠ সূরা। একে 'শিফা' বা সর্বরোগের প্রতিষেধক বলা হয়। যেকোনো শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতায় এটি পাঠ করে দম করলে মহান আল্লাহ আরোগ্য দান করেন।
২. সূরা আল-বাকারা
রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: "তোমরা নিজেদের ঘরগুলোকে গোরস্থানে পরিণত করো না। যে ঘরে সূরা আল-বাকারা তিলাওয়াত করা হয়, সে ঘর থেকে শয়তান পালিয়ে যায়।" (সহীহ মুসলিম: ৭৮০)।
৩. সূরা ইয়াসীন (কুরআনের হৃদপিণ্ড)
নবীজী (সাঃ) বলেছেন: "প্রতিটি বস্তুর একটি হৃদয় থাকে, আর কুরআনের হৃদয় হলো সূরা ইয়াসীন।" মৃত্যুর পথযাত্রী বা কঠিন বিপদগ্রস্ত ব্যক্তির জন্য এটি পাঠ করা অত্যন্ত বরকতপূর্ণ।
৪. সূরা আল-কাহফ (জুমুআর দিনের আমল)
যে ব্যক্তি জুমুআর দিনে সূরা আল-কাহফ তিলাওয়াত করবে, তার জন্য দুই জুমুআর মধ্যবর্তী সময় নূর দ্বারা উদ্ভাসিত করে দেওয়া হবে এবং সে দাজ্জালের ফেতনা থেকে নিরাপদে থাকবে। (সহীহ আল-জামিউস সাগীর: ৬৪৭৩)।
৫. সূরা আল-মুলক (কবরের আযাব থেকে মুক্তি)
৩০ আয়াত বিশিষ্ট এই সূরাটি প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর পূর্বে পাঠ করলে তা পাঠকারীর জন্য সুপারিশ করবে এবং তাকে কবরের কঠিন শাস্তি থেকে হেফাযত করবে। (তিরমিযী: ২৮৯১)।
সাজদায়ে তিলাওয়াত ও তার দো'আ
পবিত্র কুরআনে মোট ১৪টি সাজদাহর আয়াত রয়েছে। তিলাওয়াতকালে এই আয়াতসমূহ পাঠ করলে বা শুনলে একটি সাজদাহ করা ওয়াজিব। সাজদাহয় গিয়ে এই দো'আটি পাঠ করতে হয়:
আলহামদুলিল্লাহ
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের সবাইকে প্রতিদিন নিয়ম মেনে সঠিক আদব ও তারতীলের সাথে আল-কুরআন তিলাওয়াত করার এবং এর আলোয় জীবন গড়ার তৌফিক দান করুন। আমীন।