ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের মধ্যে দ্বিতীয় এবং ঈমানের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হলো সালাত (নামায)। কিয়ামতের দিন বান্দার নিকট থেকে প্রথম হিসাব নেওয়া হবে তার সালাতের। প্রিয় নবী রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) স্পষ্ট ভাষায় নির্দেশ দিয়েছেন: "তোমরা ঠিক সেভাবে সালাত আদায় করো, যেভাবে আমাকে সালাত আদায় করতে দেখেছো।" (সহীহ বুখারী: ৬৩১)। তাই সুন্নাহ সমর্থিত বিশুদ্ধ নিয়মে সালাত ও তার পূর্বশর্ত ওযূ সম্পাদন করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য আবশ্যক।
"নিশ্চয়ই নির্দিষ্ট সময়ে সালাত কায়েম করা মুমিনদের জন্য ফরয।" (সূরা আন-নিসা: ১০৩)
প্রথম পর্ব: সুন্নাহ মোতাবেক ওযূ সম্পাদনের নিয়ম
পবিত্রতা অর্জন না করে সালাত আদায় করলে তা আল্লাহর নিকট কবুল হয় না। নিচে ওযূর সুন্নাহ পদ্ধতি ধারাবাহিকভাবে উপস্থাপন করা হলো:
- নিয়্যত করা: মনে মনে ওযূর সংকল্প করা (মুখে উচ্চারণ করে নিয়্যত পড়া বিদ'আত)।
- বিসমিল্লাহ বলা: ওযূ শুরুর পূর্বে "বিসমিল্লাহ" (بسم الله) বলা সুন্নত।
- দুই হাত ধোয়া: কব্জি পর্যন্ত দুই হাত ভালোভাবে ৩ বার ধোয়া।
- মিসওয়াক ও কুলি করা: ডান হাতে পানি নিয়ে ৩ বার কুলি করা এবং মিসওয়াক করা।
- নাকে পানি দেওয়া ও ঝাড়া: ডান হাতে নাকে পানি দিয়ে বাম হাত দিয়ে নাক ৩ বার পরিষ্কার করা।
- মুখমণ্ডল ধোয়া: কপালের চুলের গোড়া থেকে চিবুকের নিচ এবং এক কানের লতি থেকে অন্য কানের লতি পর্যন্ত পুরো মুখমণ্ডল ৩ বার ভালোভাবে ধোয়া।
- দুই হাত কনুইসহ ধোয়া: ডান হাত কনুইসহ ৩ বার এবং পরে বাম হাত কনুইসহ ৩ বার ধোয়া।
- মাথা ও কান মাসাহ করা: নতুন পানি নিয়ে একবার পুরো মাথা মাসাহ করা এবং বৃদ্ধাঙ্গুলি ও তর্জনী দিয়ে কানের ভেতর ও বাইরে মাসাহ করা।
- দুই পা গিরাসহ ধোয়া: প্রথমে ডান পা টাখনু/গিরাসহ ৩ বার এবং পরে বাম পা ৩ বার পায়ের আঙুল খিলালসহ ধোয়া।
ওযূ শেষের মাসনূন দো'আ
দ্বিতীয় পর্ব: সহীহ সালাত (নামাজ) আদায়ের ধাপে ধাপে পূর্ণাঙ্গ নিয়ম
১. কিবলামুখী হয়ে দাঁড়ানো ও নিয়্যত করা
পবিত্র পোশাকে ক্বিবলামুখী হয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াতে হবে। যে ওয়াক্তের সালাত তা মনে মনে নির্ধারণ করবেন।
২. তাকবীরে তাহরীমা ও রফউল ইয়াদাইন
দুই হাত কাঁধ বা কানের লতি পর্যন্ত উঠিয়ে (রফউল ইয়াদাইন করে) বলবেন: "اللهُ أَكْبَرُ" (আল্লাহু আকবার)। এরপর ডান হাত বাম হাতের ওপর রেখে বুকের ওপর বাঁধবেন।
৩. ছানা ও ছানা পরবর্তী দো'আ পাঠ
৪. সূরা ফাতিহা ও অন্য সূরা মিলানো
আ'উযু বিল্লাহ ও বিসমিল্লাহ পড়ে ধীরস্থিরে **সূরা ফাতিহা** পাঠ করবেন। সূরা ফাতিহা শেষে মনে মনে বা শব্দ করে **"আমীন"** বলবেন। অতঃপর পবিত্র কুরআনের অন্য যেকোনো একটি সূরা বা অন্তত ৩টি বড় আয়াত পাঠ করবেন।
৫. রুকূ ও রুকূর বিশেষ তাসবীহ
আল্লাহু আকবার বলে রুকূতে যাবেন। দুই হাত দিয়ে দুই হাঁটু শক্ত করে আঁকড়ে ধরবেন এবং পিঠ সোজা সমান্তরাল রাখবেন। রুকূতে অন্তত ৩ বার পাঠ করবেন:
৬. রুকূ থেকে সোজা হয়ে দাঁড়ানো (ক্বওমাহ)
সোজা হয়ে দাঁড়ানোর সময় বলবেন: "سَمِعَ اللَّهُ لِمَنْ حَمِدَهُ" (সামি'আল্লাহু লিমান হামিদাহ)। আর পুরোপুরি সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলবেন: "رَبَّنَا وَلَكَ الْحَمْدُ حَمْدًا كَثِيرًا طَيِّبًا مُبَارَكًا فِيهِ"।
৭. প্রথম ও দ্বিতীয় সাজদাহ
আল্লাহু আকবার বলে সাজদাহয় যাবেন। সাজদাহর সময় শরীরের ৭টি অঙ্গ যমীনে স্পর্শ করবে: কপাল ও নাক, দুই হাতের তালু, দুই হাঁটু এবং দুই পায়ের আঙুলের পেট। সাজদাহয় ৩ বার বলবেন:
৮. দুই সাজদাহর মাঝের বৈঠক (জলসাহ)
প্রথম সাজদাহ থেকে উঠে সোজা হয়ে বসবেন এবং দুই সাজদাহর মাঝে পাঠ করবেন:
৯. তাশাহহুদ, দুরুদ শরীফ ও দো'আয়ে মাসূরা
দ্বিতীয় বা শেষ রাকাআতে বসে ডান হাত হাঁটুতে রেখে তর্জনী আঙুল ঈমানের সাক্ষ্য দিতে ইশারা করে পাঠ করবেন:
তাশাহহুদ (আত-তাহিয়্যাতু)
১০. সালাম ফেরানো
শেষে প্রথমে ডানদিকে মুখ ফিরিয়ে বলবেন: "السَّلَامُ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَةُ اللَّهِ" এবং পরে বামদিকে মুখ ফিরিয়ে বলবেন: "السَّلَامُ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَةُ اللَّهِ"। এর মাধ্যমে সালাত সম্পন্ন হবে।
আলহামদুলিল্লাহ
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকল সালাতকে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সহীহ সুন্নাহ অনুযায়ী আদায় করার তাওফীক দান করুন এবং আমাদের সকল ইবাদত কবুল করে নিন। আমীন।